কক্সবাজার সৈকতে এক্সাইটিং প্যারাসেইলিং

Peraseiling at Coxs Bazar

মাই ট্রাভেল ডায়েরি : প্যারাসেইলিং @ কাঁকড়া বিচ, কক্সবাজার

অনেকদিনের শখ ছিল পাখির মতো মুক্ত আকাশে ডানা মেলে উড়বো, কয়েকশো ফুট উপর থেকে দুনিয়াটা দেখবো। অবশেষে আমার সেই শখ পূরণ হলো। কিছুদিন আগে আমি, আমার হাজব্যান্ড এবং আমাদের কিছু বন্ধুসহ সবাই মিলে ঘুরতে গিয়েছিলাম বান্দরবানে। বান্দরবানে ঘুরে হুট করেই কোন প্ল্যানিং ছাড়াই ওখান থেকে সোজা চলে গেলাম সমুদ্রের টানে কক্সবাজারে। জীবনে প্রথম বারের মতো কক্সবাজারে গিয়েছিলাম হানিমুন এর সময়। তখনি আমার ইচ্ছা ছিল প্যারাসেইলিং করার কিন্তু ৭ নাম্বার সিগন্যাল এবং অবশেষে রোয়ানু আঘাত হানার কারণে তখন প্যারাসেইলিং বন্ধ ছিল যার কারণে আমার ইচ্ছাটা আর পূরণ হয়নি। এই সময়টায় যেহেতু সমুদ্র নীরব থাকে তাই এবার আর সুযোগটা মিস করলামনা। সবাই মিলে চলে গেলাম কাঁকড়া বিচে ফান ফেস্টে প্যারাসেইলিং করার জন্য। যদিও সকাল থেকেই শুরু হয় কিন্তু আমরা ইচ্ছা করেই বিকেল ৪ টার দিকে গিয়েছিলাম কারণ সূর্যাস্তের কিছুক্ষন আগে আকাশটা সূর্যের লালচে আভায় এতো সুন্দর হয়ে যায়, যা না দেখলেই নয় আর এই সময়টায় প্যারাসেইলিং করার সেই দারুন সুযোগটা আমি কোনোভাবেই মিস করতে চাইনি।

যাই হোক, যেয়ে শুনি সারাদিন প্রচন্ড বাতাসের কারণে সারাদিনই প্যারাসেইলিং বন্ধ ছিল, আমরা যাওয়ার কিছুক্ষন আগে থেকেই আবার শুরু হয়েছে তবুও শেষ পর্যন্ত করা যাবে কিনা কনফার্ম হয়ে বলা যাচ্ছেনা, সবকিছুই ডিপেন্ড করছে বাতাসের উপর। ওদের ওখানে প্যারাসেইলিং মূলত দুই ধরণের হয়ে থাকে, ফান (১৫০০ টাকা ) এবং সুপার ফান (২০০০ টাকা)। ফান এ শুধুমাত্র আকাশে ওড়ানো হয় ৪-৫ মিনিটের জন্য, ১ কিলোমিটার পর্যন্ত দূরে নেয়া হয় এবং উচ্চতায় ৩০০-৪০০ ফুট উপরে উঠানো হয়। আর সুপার ফানে ১.৫ কিলোমিটার পর্যন্ত দূরে নেয়া হয় এবং উচ্চতায় ৩৫০-৪৫০ ফুট উপরে উঠানো হয় ৫-৬ মিনিটের জন্য। এবং সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, সুপার ফানে প্রথমে ৩০০-৪০০ ফুট উপরে উঠানোর পরে আস্তে আস্তে আবার নিচে নামানো হয় এবং পানিতে একটু পা ছোয়ানোর সাথে সাথেই আবার এক টানে কয়েকশো ফুট উপরে টেনে তোলা হয়। আমরা সবাই সুপার ফান টাই ট্রাই করেছিলাম। প্রথমেই লাইফ জ্যাকেট পরিয়ে কিভাবে কি করতে হবে সব নিয়ম বলা হলো এবং কিভাবে প্যারাশুট নিয়ে ল্যান্ড করতে হবে সেটাও বুঝিয়ে দেয়া হলো। আমার আগে যারা করছিলো আমি খুব ভালোভাবে সবাইকে অবজার্ভ করছিলাম আর ভাবছিলাম বাই চান্স যদি কোনো দুর্ঘটনা হয়ে যায় তখন কি করবো ? এভাবেই দেখতে দেখতে একসময় আমার পালা চলে এলো।

প্রথমে যখন ওড়া শুরু করলাম তখন খুব একটা ভয় লাগছিলোনা, খুব মজা পাচ্ছিলাম। আমার ওয়েট কম হওয়ার কারণে আমাকে প্যারাশুট নিয়ে দৌড়াতে হয়নি, মনে হলো যেন আমাকে একটা ফানুস এর মতো করে সবাই মিলে ধরে ছেড়ে দিলো আর আমিও উড়তে শুরু করলাম। কিন্তু আস্তে আস্তে অনেক উপরে উঠে যাওয়ার পর নিচে তাকাতেই যখন দেখি দূরে সমুদ্রের পাড়ে আমার হাজব্যান্ড, বন্ধু, সবাইকে ছোট ছোট পিঁপড়ার মতো দেখা যাচ্ছে, যতদূর চোখ যায় শুধু নীলচে-সবুজ অজস্র জলরাশি ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ছে না, সাদা সাদা বাঁকা বাঁকা দড়ির মতো ঢেউগুলো সব সমুদ্রের পাড়ে গিয়ে আছড়ে পড়ছে আর চারপাশের আকাশটা তুলার মতো ঘন কুয়াশায় ঢেকে আছে তখন একটু একটু ভয় লাগা শুরু হলো। আরো ভয় লাগলো যখন বাতাসের চাপে আমার কান বন্ধ হয়ে যাচ্ছিলো, তখন কেন যেন বারবার আমার আম্মুর চেহারাটা চোখের সামনে ভাসছিলো সেই সাথে আমার জীবনের বাকি সব প্রিয় মানুষগুলোকেও খুব মনে পড়ছিলো। বারবার মনে হচ্ছিলো এখন যদি আমি কোনোভাবে এখান থেকে পরে মরে যাই তাহলে তো আর কারো সাথে কোনদিন দেখা হবেনা কথা হবেনা। এখন এগুলো মনে পড়লে যদিও খুব হাসি পায় কিন্তু তখন আসলেই টের পাচ্ছিলাম জীবনের প্রতিটা মুহূর্ত কতটা মূল্যবান। যাই হোক পরে ভয় কাটানোর জন্য চোখ বন্ধ করে শুধু একটা দোয়া পড়লাম ” লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, মুহাম্মাদুর রাসুল্লাহ ” আর সাথে সাথেই ম্যাজিকের মতো আমার ভয় অনেকটাই কেটে গেলো। এর পরের পুরোটা সময় আমি মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখছিলাম আর শুধু একটা কথাই ভাবছিলাম, আল্লাহ এতো সুন্দর করে পৃথিবীটা নিজ হাতে কি করে বানিয়েছেন ???

এখানে আরেকটা মজার কথা শেয়ার না করলেই নয়। সেটা হলো, সুপার ফানে ওরা সাধারণত ৫-৬ মিনিট সময় দেয় ওড়া শুরু করা থেকে ল্যান্ড করা পর্যন্ত। ওখানে যাওয়ার পরে আমাদের এক ফ্রেন্ড এর সাথে ওদের একজনের বেশ খাতির জমে যায় যার জন্য এক্সট্রা খাতির স্বরূপ ওরা আমাকে ইন টোটাল ৮ মিনিট উড়িয়েছিল সেই সাথে ১.৫ কিলোমিটার হয়ে গিয়েছিলো প্রায় ২ কিলোমিটার আর কতখানি উঁচুতে যে উঠেছিলাম সেটা ওরাই ভালো বলতে পারবে। এক্সট্রা খাতিরও যে অনেক সময় বিরক্তি এবং ভয়ের কারণ হতে পারে সেটাও ঐদিন খুব ভালোমতো টের পেয়েছিলাম। যাই হোক, শেষের দিকে এসে প্যারাশুট ল্যান্ড করার আগে ওরা একটা হুইসেল দেয় যেটা শুনে খুব জোরে ডান পাশের একটা নির্দিষ্ট দড়ি ধরে টান দিতে হয়। আমিও তাই করেছিলাম কিন্তু বিপরীত পাশে বাতাসের চাপ বেশি থাকার কারণে প্যারাশুট নিচে নামছিলোনা যাই হোক পরে শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে জোরে টান দিয়ে আমি সফলভাবেই প্যারাশুট নিয়ে নিচে নামতে পেরেছিলাম। এই হলো আমার ভয়ংকর মজার প্যারাসেইলিং অভিজ্ঞতা।

যদিও এটা আমার প্রথম প্যারাসেইলিং ছিল কিন্তু আমি ইউটিউবে এখন পর্যন্ত যতগুলো ভিডিও দেখেছি আমার কাছে মনে হয়েছে কক্সবাজারে প্যারাসেইলিং করে যেই মজাটা পাওয়া যাবে সেটা আর অন্য কোথাও পাওয়া যাবেনা কারণ আমার কাছে বিদেশের বিচগুলো আমাদের কক্সবাজারের মতো এতো বিস্তৃত এবং এতো উন্মুক্তও মনে হয়নি। আর কক্সবাজার তো কক্সবাজারই , এর তো আর কোনো অল্টারনেটিভ হয়না তাইনা ? ওয়ার্ল্ডস লংগেস্ট সি বিচ বলে কথা। প্যারাসেইলিং করার ইচ্ছা আছে কিন্তু ভয়ের জন্য করতে চাননা তাদের উদ্দেশে বলছি, ভয়কে জয় করার চেষ্টা করুন, অন্যরকম একটা মজা পাবেন। সত্যি বলছি, প্যারাসেইলিং করার পরে আমার মতো মনে হবে, ইশ ভাগ্যিস করেছিলাম নাহলে কি মজাটাই না মিস করতাম হাহাহা … সবাই ভালো থাকবেন 🙂

নোট : দুর্বল চিত্তের কেউ ভুলেও প্যারাসেইলিং করার চেষ্টা করবেন না। করলেও নিজ দায়িত্বে করবেন, এর জন্য কর্তৃপক্ষ দায়ী নহে।

(নুসরাত জে. মাহমুদ থেকে সংগৃহীত)

02 March, 2018 | 11:39 Saiful Talukder 1 Comment

One response to “কক্সবাজার সৈকতে এক্সাইটিং প্যারাসেইলিং”

  1. arif says:

    Very informative

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *